ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব

এশিয়ায় সংকুচিত কারখানা কার্যক্রম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত শুল্কনীতির প্রভাবে এশিয়ার বেশির ভাগ দেশে কারখানা কার্যক্রমে সংকোচন দেখা যাচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত শুল্কনীতির প্রভাবে এশিয়ার বেশির ভাগ দেশে কারখানা কার্যক্রমে সংকোচন দেখা যাচ্ছে। যদিও এ শুল্কনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য চীনে কারখানা কার্যক্রম অপ্রত্যাশিতভাবে কিছুটা বেড়েছে। দুই আন্তর্জাতিক সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ও রেটিংডগের গতকাল প্রকাশিত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, এশিয়ার ভঙ্গুর অর্থনীতি এখনো পুনরুদ্ধার পর্যায়ে রয়েছে। কারখানা কার্যক্রমে শিথিলতা পুনরুদ্ধারের গতি বজায় রাখতে নীতিনির্ধারকদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ায় কারখানা কার্যক্রমে সংকোচন এখন বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ মার্কিন শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগেই এশিয়ার অনেক উৎপাদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি বাড়িয়ে দিয়েছিল। আগামী মাসগুলোয় রফতানির গতি শ্লথ হয়ে এলে এসব কোম্পানির মুনাফা চাপে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জরিপে দেখা যাচ্ছে, গত মাসে এশিয়ার রফতানিনির্ভর দেশ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের উৎপাদন কার্যক্রম কমে গেছে। এর মধ্য দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির অভিঘাত সামাল দেয়া এশিয়ার জন্য কঠিন হয়ে পড়ার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দাই-ইচি লাইফ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উদীয়মান বাজারবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ তোড়ু নিশিহামা বলেন, ‘এশীয় অর্থনীতির জন্য এটি দ্বিগুণ আঘাত। একদিকে উচ্চ মার্কিন শুল্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের, অন্যদিকে চীনের সস্তা দামের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সামনে আমরা সম্ভবত মার্কিন শুল্কের প্রভাব আরো তীব্র হতে দেখব। বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রমুখী রফতানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

চীনে কারখানা কার্যক্রম নিয়ে জরিপটি মূলত রেটিংডগের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। এক্ষেত্রে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের পদ্ধতি ব্যবহার করেছে সংস্থাটি। তাদের চায়না জেনারেল ম্যানুফ্যাকচারিং পিএমআই (পিএমআই) অনুসারে, জুলাইয়ের ৪৯ দশমিক ৫ থেকে গত মাসে চীনে সূচকটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ৫। এক্ষেত্রে বাজারের সব পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে শিল্পোৎপাদন সূচকটি। এটি উৎপাদন বৃদ্ধি ও সংকোচনের নিরপেক্ষ সীমা ৫০ অতিক্রম করেছে।

তবে এ ফল গত রোববার প্রকাশিত চীনের সরকারি জরিপের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সেখানে দেখা যাচ্ছে, টানা পঞ্চম মাসের মতো আগস্টে চীনের উৎপাদন কার্যক্রম কমে গেছে। এর কারণ হলো দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে অনিশ্চয়তা।

দুই জরিপের ফলাফল বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের দ্বিতীয় ও এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি এখনো ব্যাপক চাপের মধ্যে আছে। রেটিংডগের প্রতিষ্ঠাতা ইয়াও ইউ বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীনের উৎপাদন খাত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করছে। তবে এ পুনরুদ্ধার সব খাতে সমানভাবে দেখা যাচ্ছে না, বরং অসমভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ঘটছে।’

চীনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সাম্প্রতিক বছরে বরাবরই অভ্যন্তরীণ চাহিদা বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইয়াও ইউ বলেন, ‘বর্তমানে দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা, অতিরিক্তভাবে চাপে থাকা আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ এবং ধীর লয়ে মুনাফা পুনরুদ্ধার দেখছে চীন। এ প্রেক্ষাপটে উৎপাদন খাতের পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের ওপর। একটি হলো রফতানি প্রকৃত অর্থে স্থিতিশীল হবে কিনা এবং অন্যটি দেশীয় চাহিদা কত দ্রুত গতি পাচ্ছে তার ওপর।’

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল জাপান ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) আগস্টে দাঁড়িয়েছে ৪৯ দশমিক ৭-এ। এটি জুলাইয়ের ৪৮ দশমিক ৯ থেকে বেশি হলেও টানা দ্বিতীয় মাসের মতো ৫০-এর নিচে রয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত, পিএমআই সূচকের মান ৫০-এর নিচে থাকলে তার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট দেশে শিল্পোৎপাদন কমে গেছে। আর এর বেশি হওয়ার অর্থ হলো ওই দেশে শিল্পোৎপাদন বেড়েছে।

জরিপ অনুসারে, গত বছরের মার্চের পর জাপানে আসা বিদেশী ক্রয়াদেশ সবচেয়ে দ্রুত হারে কমেছে। কারণ চীন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে দুর্বল চাহিদার সঙ্গে লড়াই করছে দেশটির কোম্পানিগুলো।

গত মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার কারখানার কার্যক্রমও সংকুচিত হয়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের হিসাবে আগস্টে দেশটিতে পিএমআই ছিল ৪৮ দশমিক ৩, যা জুলাইয়ের ৪৮ থেকে সামান্য বেশি হলেও টানা সপ্তম মাসের মতো সংকোচন নির্দেশ করছে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে। এতে শুল্ক চাপ কিছুটা কমলেও পুরোপুরি দূর হয়নি।

জুলাইয়ে এক চুক্তির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে জাপানি পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়ে আনতে সম্মত হয় ওয়াশিংটন। এতে যুক্তরাষ্ট্রে জাপানের প্রধান রফতানি পণ্য গাড়ির ওপর আরোপিত শুল্ক ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে নামিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। দক্ষিণ কোরিয়াও জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে, যেখানে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়, যা আগস্ট থেকে কার্যকর হচ্ছে।

জরিপে দেখা গেছে, আগস্টে তাইওয়ানের উৎপাদন কার্যক্রম দুর্বল হয়েছে। তবে ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার উৎপাদন বেড়েছে।

আগস্টে ১৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত হারে বেড়েছে ভারতের উৎপাদন কার্যক্রম। এ সময় দেশটির কারখানা কার্যক্রমে উৎসাহিত করেছে শক্তিশালী চাহিদা। তবে ট্রাম্প প্রশাসন গত মাসে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করছে। এ শুল্ক আগামী প্রান্তিকগুলোয় ভারতের প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে।

এশিয়ায় মার্কিন শুল্কের বিস্তৃতির প্রভাব প্রসঙ্গে ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের বাজার অর্থনীতিবিদ শিভান ট্যান্ডন বলেন, ‘ভবিষ্যতের দিকে তাকালে মনে হয়, মার্কিন শুল্ক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল করবে। এটি এশিয়ার রফতানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য বড় চাপ হয়ে দেখা দেবে।’

আরও